Showing posts with label জীবনী. Show all posts
Showing posts with label জীবনী. Show all posts

Saturday, December 12, 2015

ক্লিওপেট্রা মোহিনী এক নারী

ক্লিওপেট্রা প্রাচীন মিসর এবং ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নাম। ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী তিনি। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, পরমাসুন্দরী হিসেবে তার খুব বেশি খ্যাতি ছিল না। কিন্তু তীক্ষন বুদ্ধিমত্তা, অন্যকে বশ করার প্রত্যয়ী মতা, সহজাত রসবোধ এবং প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষ ও তা বাস্তবায়নের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি সর্বকালের সেরা মহিলাদের কাতারে স্থান করে নিয়েছেন। তাকে মনে করা হয় সম্মোহনী সৌন্দর্য আর সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে এবং সীমিত শক্তিকে অসাধারণ কৌশলে অসীমে নিয়ে যাওয়ার রূপকার হিসেবে।
প্রেম আর মৃত্যু এই নারীর জীবনে একাকার হয়ে গেছে। তিনি যেমন ভালোবাসার উদ্যাম হাওয়া বইয়ে দিতে পারতেন, তেমনি প্রয়োজনে মারাত্মক হিংস্রও হতে পারতেন। পথের কাঁটা মনে করলে যে কাউকে নির্মমভাবে সরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতেন না। রোমান রাজনীতির অত্যন্ত সঙ্কটজনক অধ্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সে যুগের নারীদের মতো সাদামাটা জীবন মেনে নেননি। বরং নিজেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আর তাই শত বছর পরও তাকে স্মরণ করা হয়। তবে অন্য সব কিংবদন্তি চরিত্রের তুলনায় কিওপেট্রা ভিন্ন মাত্রা সৃষ্টি করেছেন। সবাই ইতিহাসের নানা পরিক্রমায় নানাভাবে আবির্ভূত হন। কিন্তু ক্লিওপেট্রা তার জীবিতকালেই শত্র“পক্ষের যে নেতিবাচক প্রচারণার শিকার হয়েছিলেন, এত বছর পরও তা কমেনি। প্রতি যুগেই তার চরিত্রকে নানাভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছে। কখনো তিনি শত্র“, কখনো স্বাধীনতাকামী, কখনো যৌন আবেদনময়ী নারী, কখনো খলনায়িকা নানা জনে নানা যুগে এভাবেই তাকে চিত্রিত করে চলেছে। এই কাজটি প্রয়োজনমতো কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো সাহিত্যিক, কখনো চিত্রকর, কখনো বর্ণবাদী গোষ্ঠী, কখনো স্বাধীনতাকামীরা করেছেন।
মাত্র ৩৯ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। এই স্বল্প সময়েই তিনি একের পর এক নাটকীয় ঘটনার সৃষ্টি করেন। সে যুগের কোনো পুরুষের পক্ষেও যে ধরনের কাজ করা ছিল প্রায় অসম্ভব, তিনি সেসব কাজেরও আঞ্জাম দিয়েছেন। ইতিহাস ও নাটকে তার ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। বিশ্ববিখ্যাত অনেক সাহিত্যিকই তাকে নিয়ে কালজয়ী উপাখ্যান রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে আছে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড কিওপেট্রা’, জর্জ বার্নাড শর ‘সিজার কিওপেট্রা’, জন ড্রাইডেনের ‘অল ফর লাভ’, হেনরি হ্যাগার্ডের ‘ক্লিওপেট্রা’। অনেক কাহিনীতে ভালো দিকের চেয়ে খারাপ দিককেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। হ্যালিওয়েল তাকে ‘দ্য উইকেডেস্ট উইম্যান ইন দ্য হিস্ট্রি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দান্তের মতে, লালসার শাস্তি হিসেবে কিওপেট্রা নরকের দ্বিতীয় স্তরে দাউ দাউ করে পুড়ছেন। কারো কারো দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন ‘সারপেন্ট অব দ্য নাইল’। অনেকেই তার যৌন আবেদনময়ী দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। পশ্চিমা লেখকদের অনেকেই তাকে এশিয়ান হিসেবে এবং এশিয়ানদের সব কিছুই যে খারাপ তা বোঝানোর জন্যও তার নেতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন বা তাদের উর্বর মস্তিষ্কে অনেক কিছু আবিষ্কৃতও হয়েছে। তা ছাড়া অক্টাভিয়ান তার বিজয়ের পর যাতে শুধু রোমানদের লেখা ইতিহাসই টিকে থাকে সে জন্য মিসরের প্রায় দুই হাজার নথিপত্র পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ কারণেও প্রকৃত ইতিহাস অনেকাংশেই পাওয়া যায় না।
সাম্রাজ্যবাদী রোমানরা তখন কিওপেট্রাকে খলনায়িকা হিসেবেই পরিচিত করতে চেয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা এখনো রয়ে গেছে। যত দিন তার নামটি টিকে থাকবে, তত দিন এই রূপান্তরও চলতে থাকবে। আর এত কিছুর মধ্যে তার জীবনের সত্যিকারের ঘটনাপ্রবাহে অনেকাংশেই বিকৃতি ঘটেছে।
এত কিছুর পরও তার সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মিসরের রানী ছিলেন তিনি। অথচ তার দেহে খাঁটি মিসরীয় রক্ত ছিল না। অবশ্য তবুও তিনি মিসর এবং মিসরীয়দের ভালোবাসতেন। তাদের উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ করেছেন। চাষাবাদের সুবিধার জন্য নীল নদ থেকে খাল কেটে আলেক্সান্দ্রিয়ার ভেতরে নিয়ে গিয়েছিলেন। মিসরের ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছেন। প্রাণবন্ত এই রাজকুমারী সহজেই সবার সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মিসরীয়সহ তিনি মোট ৯টি ভাষা জানতেন। গণিতবিদ ও ব্যবসায়ী হিসেবেও তার সুনাম ছিল। রাজনৈতিক কারণে তিনি নিজেকে সূর্যদেবতা ‘রা’-এর বংশধর হিসেবে প্রচার করতেন এবং দেবী আইসিসের শিরোস্ত্রাণ পরতেন। সাহিত্য ও দর্শনে তার প্রবল অনুরাগ ছিল। তার চূড়ান্ত ল্য ছিল রোমের আওতার বাইরে থেকে প্রথম টলেমি প্রতিষ্ঠিত পুরো এলাকার রাজমতা লাভ করা। তাই তাকে বলা যায়, রোম সাম্রাজ্য বিস্তারের একটি বাধা হিসেবে।
সাধারণভাবে তিনি ক্লিওপেট্রা সপ্তম হিসেবে পরিচিত। মেসিডোনিয়ান বংশোদ্ভূত সপ্তম মিসরীয় রানী হওয়ায় তাকে এই পরিচিতি বহন করতে হয়। তার আগে আরো ছয়জন কিওপেট্রা ছিলেন। তিনি ছিলেন টলেমি দ্বাদশের তৃতীয় মেয়ে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯ সালে। তিনি জুলিয়াস সিজারের প্রেমিকা ও মার্ক অ্যান্টনির স্ত্রী হিসেবেই বেশি খ্যাত। তার পূর্বপুরুষ টলেমি ছিলেন মহামতি আলেক্সান্ডারের একজন সেনাপতি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে আলেক্সান্ডার মারা গেলে তার অন্যতম সেনাপতি টলেমি মিসরে স্বাধীন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। কিওপেট্রা এই বংশেরই শেষ শাসক। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মিসরে প্রায় ৩০০ বছরের মেসিডোনিয়ান শাসনের অবসান ঘটে। তার মায়ের দিককার পরিচয় অবশ্য পাওয়া যায় না। এ কারণে তিনি রোমানদের মতো শ্বেতাঙ্গ ছিলেন, নাকি অনেক মিসরীয়র মতো কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন, তা জানা যায় না।
ক্লিওপেট্রার প্রেম আর যুদ্ধের কাহিনী শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৫১ সালে পিতা টলেমি আওলেটেস মারা যাওয়ার পর। এ সময়ে ক্লিওপেট্রার বয়স হয়েছিল ১৮ বছর। টলেমি আওলেটেস তার উইলে কিওপেট্রাকে তার ছোট ভাই টলেমি ত্রয়োদশের (সে সময় তার বয়স ছিল ১২ বছর) সাথে উত্তরসূরি মনোনীত করেন। ধারণা করা হয় কিওপেট্রার বড় দুই বোনের একজন (ক্লিওপেট্রা ষষ্ঠ) শৈশবেই মারা গিয়েছিলেন ও অপরজনকে (বেরেনিস) টলেমি আওলেটেসই হত্যা করেছিলেন। এ ছাড়া কিওপেট্রার ছোট আরো দু’টি ভাই ছিল।
সে সময়ের মুদ্রায় অঙ্কিত ছবিতে ক্লিওপেট্রাকে পরমাসুন্দরী হিসেবে দেখা যায় না। তবে তার প্রসন্ন ভাব, স্পর্শকাতর নিখুঁত গ্রিসিয়ান মুখাবয়ব, গোলাকার দৃঢ় চিবুক, ধনুকের মতো ঢেউ খেলানো ভুরু যুগলের নিচে অদ্ভুত সুন্দর ভাসা ভাসা চোখ, প্রশস্ত ললাট আর সুতীক্ষন নাসিকার চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। আর সৌন্দর্যে কিছুটা ঘাটতি থেকে থাকলেও প্রখর বুদ্ধিমত্তা, যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতা, অপরকে বশ করার সামর্থ্য তাকে তুলনাহীন করে তুলেছিল।
ক্লিওপেট্রার কাহিনীর মধ্যে রোমান বীরদের সাথে সাথে মিসরের সেথ রাজবংশের শেষ উত্তরাধিকারী হার্মেসিস এবং তার দূর সম্পর্কিত বোন চারমিয়নের কথাও এসে যায়। তারাও চেয়েছিলেন কিওপেট্রাকে উৎখাত করে মিসরে মিসরীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। এখানে ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনীও অনেকের লেখায় ফুটে উঠেছে। রাজ জ্যোতিষীবেশে কিওপেট্রার পাশে হার্মেসিসকে এবং পরিচারিকা হিসেবে চারমিয়নকে দেখা যায়। পরিণাম অবশ্য বেশ মর্মান্তিক।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫১ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি ভাই টলেমি ত্রয়োদশের সাথে যৌথভাবে মিসরের শাসক হন (খ্রিষ্টপূর্ব ৫১-৪৭)। সে কালে মিসরে ভাই-বোন বিয়ে প্রচলিত ছিল (মিসরের আইন অনুযায়ী ভাই বা পুত্র যেকোনো একজনকে অংশীদার করতেই হতো, এ ক্ষেত্রে বয়স কোনো ব্যাপারই নয়)। তাই ক্লিওপেট্রা একাধারে ছিলেন সম্রাটের বোন ও স্ত্রী। তবে দু’জনের মধ্যকার সুসম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। কিছু সময় পরেই দু’জনের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরে। ক্লিওপেট্রা সব সরকারি দলিলপত্র থেকে তার ভাইয়ের নাম মুছে ফেলতে থাকেন। এমনকি মুদ্রায় তার একক পোর্ট্রেট ও নাম সংযোজন করেন। তবে তিনি টিকতে পারেননি। দেশে বিশৃঙ্খলা, দুর্ভি, প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলে কিওপেট্রাকে মতা থেকে সরে যেতে হয়। কিন্তু তিনি দমে যাননি। ধারণা করা হয় বোন আরসিনোইকে নিয়ে আরব সৈন্যদের সহায়তায় তিনি সিরিয়ায় চলে যান এ সময়।
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮ সালে রোমের অধিপতি জুলিয়াস সিজার তার প্রতিদ্বন্দ্বী পম্পেইর পিছু ধাওয়া করতে করতে মিসরে উপস্থিত হন। পম্পেই আশা করেছিলেন মিসরে তিনি আশ্রয় পাবেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছার অব্যবহিত পরেই তিনি নিহত হলেন। এর চার দিন পর সিজার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে মিসরে পৌঁছলেন। মিসর-সম্রাট টলেমি তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও সফল হতে পারেননি।
ক্লিওপেট্রা পুরো ঘটনাবলির ওপর তীক্ষন নজর রাখছিলেন। তিনি সুযোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দেখলেন সিজার শক্তিশালী এবং সেই সাথে একনায়ক। সবচেয়ে বড় কথা তার ওপর নির্ভর করা যায়। তার সহায়তায় ক্লিওপেট্রা আবার রাজমতা ফিরে পাওয়ার উদ্যোগ নেন। এ সময় সিজারের চাহিদা ছিল সম্পদের। আর কিওপেট্রার মতা। দু’জন দু’জনের পরিপূরক হিসেবে অবস্থান নিলেন। এতে দু’জনই লাভবান হলেন।
সিজারের সাথে ক্লিওপেট্রার সাক্ষাতের ঘটনাটিও বেশ আকর্ষণীয়। আলেক্সান্দ্রিয়ায় রাজপ্রাসাদে সিজারের পাহারায় ছিল কিওপেট্রার স্বামী-ভাইয়ের বাহিনী। ফলে পরিচয় প্রকাশ করে সিজারের কাছে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। তাই কৌশল গ্রহণ করলেন। এক ব্যবসায়ীকে হাত করলেন। এক দিন সিজারের সামনে রোল করা কয়েকটি কার্পেট আনা হলো। একে একে খোলা হলো সিজারের সামনে। সেগুলোরই একটির ভেতর থেকে নাটকীয়ভাবে বেরিয়ে এলেন ক্লিওপেট্রা। তার বুদ্ধিমত্তা আর সৌন্দর্যে ভেসে গেলেন রোমান সম্রাট। কী ঘটতে যাচ্ছে টলেমি ত্রয়োদশ ঠিকই বুঝতে পারলেন। তিনি নগরবাসীকে পোনোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু এবারো ব্যর্থ হলেন। পরিণতিতে তাকে নীল নদে ডুবিয়ে দেয়া হলো।
অবশ্য তার আগে থেকেই মিসরের ব্যাপারে রোমান শাসকেরা নাক গলাতে শুরু করেছিল। কিওপেট্রার পিতা রোম সম্রাটের সাহায্যে মতা পুনর্দখল করেছিলেন। অনেকের মতে, সিজার চেয়েছিলেন ক্লিওপেট্রাকে মিসরে রোমের বশংবদ হিসেবে রাখতে। সমঝোতা হিসেবে কিওপেট্রা তার অপর ভাই টলেমি চতুর্দশকে (এই সময় তার বয়স ছিল ১১ বছর) বিয়ে করেন (তা স্থায়ী হয়েছিল ৪৭-৪৪ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত)। এই বিয়েটা হয়েছিল আলেক্সান্দ্রিয়াবাসী ও মিসরের পুরোহিতদের খুশি রাখতে। কারণ বিয়ে সত্ত্বেও একই সাথে তিনি সিজারের ১৫ দিন মিসরে অবস্থানকালে তার প্রেমিকা হিসেবেও বহাল থাকেন। চাঁদনি রাতে বজরায় করে দুইজনে নীলনদে ভেসে বেড়ান। সিজারের এক পুত্রসন্তানের জন্মও দেন তিনি। তার নাম রাখা হয় সিজারিয়ান (ছোট সিজার বা টলেমি সিজার)। সে-ই ছিল সিজারের একমাত্র পুত্র। রোমে অবস্থিত সিজারের স্ত্রীর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। পরে এই সিজারিয়ানের সাথে কিওপেট্রা আবার মিসরের রাজমতা পরিচালনা করেন (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪-৩০)।
পম্পেই এবং অন্যান্য শত্র“ দমন করতে সিজারের কয়েক বছর কেটে যায়। তবে দু’জনের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। কিওপেট্রা প্রায়ই সিজারের সাথে সাাৎ করতে যেতেন। আসলে তিনি রোমান শাসকদের সাথে সুসম্পর্ক রেখেই মিসরের স্বাধীনতা বজায় রাখতে চাইতেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ সালে সিজারের অনুরোধে ক্লিওপেট্রা পুত্র এবং তার স্বামী-ভাইকে নিয়ে রোমেও যান তার জয়োল্লাস প্রত্য করতে। রোমে সিজার কিওপেট্রাকে অত্যন্ত সম্মানিত আসন দান করেন। এমনকি ভেনাসের মন্দিরে ক্লিওপেট্রার একটি স্বর্ণমূর্তিও স্থাপন করা হয়। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, সিজারিয়ান তার ছেলে। কিন্তু এসব কিছু রোমানদের ভালো লাগেনি। এমনকি তারা মনে করতে থাকে সিজার হয়তো ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, যদিও রোমান আইনে একই সাথে দুই স্ত্রী রাখা কিংবা বিদেশিনী বিয়ে করা নিষিদ্ধ। তা ছাড়া জুলিয়াস সিজার রাজধানী আলেক্সান্দ্রিয়ায় সরিয়ে নিতে চান বলেও গুজব ছড়ানো হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ সালে তার রোমে অবস্থানের সময়েই সিনেট ভবনের বাইরে সিজার সিনেটরদের হাতে নিহত হন মাত্র ৫৫ বছর বয়সে। সিজারের আকস্মিক মৃত্যুতে ক্লিওপেট্রার নিরঙ্কুশ মতা লাভের প্রথম প্রয়াস ব্যর্থ হয়। কারণ সিজার ক্লিওপেট্রা কিংবা সিজারিয়ানকে তার উত্তরসূরি মনোনীত করে যেতে পারেননি।
ক্লিওপেট্রা মিসরে ফিরে আসেন। রোমান রাজনীতিতে তিনি নিরপেক্ষ থাকার নীতি অবলম্বন করেন। তবে রোমান রাজনীতির ওপর তীè নজর রাখছিলেন। তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন, যে-ই চূড়ান্তভাবে জয়ী হবে, তিনি থাকবেন তার পাশে। অযথা কাউকে শত্র“ বানিয়ে লাভ কী! পরবর্তী রাউন্ডের জন্য তিনি অপোয় থাকলেন। যা-ই হোক, দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৪২ সালে। প্রতিদ্বন্দ্বী অল্প বয়স্ক গেয়াস অক্টাভিয়াসকে বেকায়দায় রেখে এ সময় মার্ক অ্যান্টনি হন রোমের শাসক। অ্যান্টনির সাথে ক্লিওপেট্রার আগেই সামান্য পরিচিতি ছিল। ক্লিওপেট্রা আবার পরিকল্পনা করেন, রোমান শক্তি দিয়েই রোমকে রুখতে হবে।
রোমের শাসনমতা পেয়েই অ্যান্টনি অন্যান্য রোমান জেনারেলের মতো পারস্য অভিযান শুরুর উদ্যোগ নেন। সুযোগটি নিলেন ক্লিওপেট্রা। অ্যান্টনি ছিলেন বিবাহিত। তার স্ত্রী ফুলভিয়া ইতালিতে অবস্থান করে স্বামীর প্রতিদ্বন্দ্বীদের নানাভাবে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ক্লিওপেট্রার ছলাকলায় মুগ্ধ হয়ে সব কিছু ভুলে গেলেন অ্যান্টনি। ক্লিওপেট্রা নিজে উদ্যোগী হয়ে জাঁকজমকভাবে এশিয়া মাইনরের টারসাসে তার কাছে যান। একজন পরাক্রমশালী জেনারেল হওয়া সত্ত্বেও অ্যান্টনি ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল, আসঙ্গলিপ্সু এবং ছটফটে চরিত্রের মানুষ। কিওপেট্রা এই দিকটি জেনে নিলেন এবং নিজের স্বার্থে তা ভালোভাবেই কাজে লাগালেন। নিজের মতায় তিনি ছিলেন যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। এ সময় তার বয়স ছিল ২৮ কি ২৯ বছর। সুন্দরী মেয়েদের বাওয়া রুপার পাতে মোড়া নৌকার গলুই, মুক্তা ও রত্নরাজিতে পাল সাজিয়ে প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির সাজে আধশোয়া ক্লিওপেট্রাকে যখন মার্ক অ্যান্টনির কাছাকাছি পৌঁছালেন, বলাবাহুল্য, অ্যান্টনি নিজেকে সংবরণ করতে পারেননি। রোম সম্রাট অ্যান্টনি পারস্য অভিযান বাদ দিয়ে কিওপেট্রার ‘কেনা গোলাম’ হিসেবে তার সাথে আলেক্সান্দ্রিয়ায় (মিসরের তদান্তীন রাজধানী) যান। ক্লিওপেট্রা অ্যান্টনিকে বশে বা ভুলিয়ে রাখার জন্য সম্ভব সব কিছু করেন। ক্লিওপেট্রার মোহে বন্দী রোমান সম্রাট অ্যান্টনি ঘোষণা করেন, মিসর রোমের করদরাজ্য নয়, বরং মিসর স্বাধীন একটি দেশ আর কিওপেট্রা এ দেশের রানী।
বেশ কিছু দিন তারা একত্রে কাটান। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০ সালে তিনি রোমে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী অক্টাভিয়াসের সাথে বোঝাপড়া করার উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগ সাময়িকভাবে সফল হয়। সমঝোতা হিসেবে অ্যান্টনি প্রতিদ্বন্দ্বী অক্টাভিয়াসের (পরে সম্রাট অগাস্টাস হিসেবে পরিচিত) বিধবা বোন অক্টাভিয়াকে বিয়ে করেন (এর কিছু দিন আগে তার আগের স্ত্রী ফুলভিয়া মারা গিয়েছিল)। সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী হওয়া সত্ত্বেও অক্টাভিয়ার দুর্ভাগ্য, তার সন্তান হয় কন্যা। পুত্র হলে ইতিহাস অন্য হতে পারত। যা-ই হোক, তিনি তিন বছরের মধ্যে বুঝতে পারলেন, অক্টাভিয়াসের সাথে তার সম্প্রীতি টিকবে না। তাই বিকল্প ভাবতে থাকলেন। এ সময় কিওপেট্রাও চুপচাপ বসে ছিলেন না। তিনিও আরেকটি খেলায় মেতে উঠেছিলেন। তিনি রোমের আরেকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হেরোডকে বশ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে সফল হননি।
এ দিকে ক্লিওপেট্রার জন্য অ্যান্টনির মন উতলা হয়ে ওঠে। তাই তিনি মিসরে কিওপেট্রার সান্নিধ্যে চলে আসেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৬ সালে তারা বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। এটি ছিল একটি চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ঘটনা। ইতোমধ্যে জন্ম নেয়া কিওপেট্রার দুই জমজ সন্তানকে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে অ্যান্টনি স্বীকৃতি দেন। এটা এক দিকে অক্টাভিয়াস ও তার বোন অক্টাভিয়ার জন্য ছিল একটি অত্যন্ত অসম্মানজনক আঘাত। আবার রোমান আইন অনুযায়ী এই বিয়ে ছিল অবৈধ। তাই পুরো রোম অক্টাভিয়াসের সাথে একজোট হয়। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে অ্যান্টনিকে দমন করতে অগ্রসর হয়। অক্টাভিয়াস-অ্যান্টনি যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অ্যান্টনিও ৩১ সালে অক্টাভিয়াকে চূড়ান্তভাবে তালাক দেন।
তবে ক্লিওপেট্রাকে খুশি করতে এবং সেই সাথে আলেক্সান্দ্রিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন সাম্রাজ্য গড়ার দিকেও অ্যান্টনি নজর দেন। ৩৪ সালে তিনি মিসর, সাইপ্রাস, ক্রিট, সিরিয়ার শাসনমতা কিওপেট্রাকে দান করেন। কিন্তু বেশি দিন শান্তিপূর্ণভাবে এই মতা ভোগ করতে পারেননি।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২-৩১ সালে অ্যান্টনি-ক্লিওপেট্রা প্রতিকূলতার মধ্যেও গ্রিসে অবস্থান করেন। এ দিকে অক্টাভিয়ান অ্যান্টনিকে হারিয়ে রোমের নিরঙ্কুশ মতা পেতে সর্বাত্মক প্রয়াস শুরু করেন। অক্টাভিয়ান খ্রিষ্টপূর্ব ৩১ সালে চূড়ান্ত অভিযান চালনা করেন। গ্রিসের দক্ষিন উপকূলে অনুষ্ঠিত হয় এই যুদ্ধ। অ্যান্টনি ছিলেন স্থলযুদ্ধে পারদর্শী। কিন্তু কিওপেট্রার পরামর্শেই তিনি নাকি নৌযুদ্ধে নেমেছিলেন। নৌযুদ্ধের অত্যন্ত সন্ধিণে কিওপেট্রা হঠাৎ করেই তার বাহিনী প্রত্যাহার করে নেন। কেন তিনি এই বাহিনী সরিয়ে নিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এর ফলে যুদ্ধে অ্যান্টনি পরাজিত হয়ে যুদ্ধত্রে থেকে পালিয়ে আসে। এই যুদ্ধের মাধ্যমে অক্টাভিয়ান রোমের সম্রাট হন। আর অ্যান্টনির সব মতা শেষ হয়ে যায়। সেই সাথে ক্লিওপেট্রার কাছে অ্যান্টনি মূল্যহীন হয়ে পড়লেন। ক্লিওপেট্রাও নতুন চাল শুরু করেন। এবার তার সব পরিকল্পনা রচিত হতে থাকে অক্টাভিয়াসকে তার মায়াজালে বন্দী করতে। কিন্তু এখানেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করেন। পরিণতিতে তিনি জীবন পর্যন্ত খোয়ান।
তিনি বুঝতে পারলেন, অক্টাভিয়াসকে হাত করতে হলে অ্যান্টনিকে বাদ দিতে হবে। অথচ অ্যান্টনিকে হত্যা করার বা মিসর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার কোনো মতা তখন তার নেই। তাই সে যাতে আত্মহত্যা করতে উদ্বুদ্ধ হয় তিনি সেই পথ বের করলেন। ভাবলেন, এতে অনায়াসেই তিনি তার স্বার্থ হাসিল করতে সম হবেন। কিওপেট্রা এক দিন নিজের সুরতি মন্দিরে অবস্থান নিয়ে প্রচার করে দেন, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর খবর পেয়ে অ্যান্টনির বেঁচে থাকার সব ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেন। তিনি তার তরবারি নিজের বুকে বিদ্ধ করেন। কিন্তু পরণেই তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ভুল শুনেছেন বা তাকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। কিন্তু ততণে তার পরপারের ডাক চলে এসেছে। তবে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে কিওপেট্রার কাছে নেয়া হয়। তিনি তার কোলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১০ মাস পরে বিজয়ী অক্টাভিয়াস আলেক্সান্দ্রিয়ায় আসেন। এ সময় ক্লিওপেট্রা অক্টাভিয়াসকে সম্মোহিত করতে চাইলেন। আগে তিনি দু’বার দুই দোর্দণ্ড শক্তিশালী সম্রাটকে নিজের মায়াজালে মোহিত করে কব্জায় এনেছিলেন। কিন্তু তৃতীয়বার পুরোপুরি ব্যর্থ হন। তবে অক্টাভিয়াস চাইছিলেন, যেভাবেই হোক ক্লিওপেট্রাকে জীবিত ধরতে হবে। তাই তিনি তাকে নানা আশ্বাস দিচ্ছিলেন। অক্টাভিয়া নিজেও জানতেন, তিনি যদি কিওপেট্রার চোখের দিকে তাকান, তবে সাথে সাথে তার সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাই তিনি কিওপেট্রার সাথে কথা বলার সময় সর্বণ চোখ রেখেছিলেন মেঝের দিকে। তাই ক্লিওপেট্রা বুঝতে পারলেন এই রোমান সম্রাটকে বশ করা যাবে না। তার মনে হলো অক্টাভিয়াস বুঝি তাকে লাঞ্ছিত করবে। হয়তো মিসর বা রোমের রাজপথে যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী হিসেবে তাকে ও তার সন্তানদের লোহার শিকল পরিয়ে প্রদর্শন করবে। এটা মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি।
অপমানের আশঙ্কায় তিনি ভেঙে পড়েন। এই অপমানের চেয়ে মৃত্যুই তার কাছে শ্রেয় মনে হলো। তাই তদানীন্তন রাজকীয় প্রথা হিসেবে বিষধর এক বিশেষ ধরনের সাপের (অ্যাস্প্ নামের এই সাপ হয় মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা, অথচ তাদের বিষ মারাত্মক। ডুমুরের ঝুড়িতে করে বিশেষ ব্যবস্থায় আনা হয়েছিল সাপ দু’টি) ছোবলে আত্মহত্যা করেন। ওই সময়ে মিসরে মনে করা হতো সাপের কামড়ে মারা যাওয়া মানুষ অমরত্ব লাভ করে। তাই কিওপেট্রা ওই পথই বেছে নিলেন। দিনটি ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩০ সালের ৩০ আগস্ট। অ্যান্টনি ও কিওপেট্রা দু’জনকেই রোমে সমাহিত করা হয়। ৩৯ বছরের জীবনে তিনি ২২ বছর রানী এবং ১১ বছর অ্যান্টনির সাথী ছিলেন। তাকে যৌন বিকৃতিগ্রস্ত মহিলা হিসেবে কোনোভাবেই চিহ্নিত করা যায় না। কারণ সিজার ও অ্যান্টনি ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে দেখা যায় না তার প্রেমিক হিসেবে। তা ছাড়া তিনি তাদের দু’জনকেও একসাথে কাছে টানেননি। তিনি মিসরকে রা করতে চেয়েছিলেন যেকোনো মূল্যে।
অনেকে মনে করেন, তার উচ্চাভিলাষ কিছুটা কম হলে তিনি আরো অনেক বেশি মতা পেতেন এবং তা বেশি দিন উপভোগ করতে পারতেন। নারী হয়েও পুরুষের একচ্ছত্র প্রাধান্য স্বীকার করেননি। সাম্রাজ্যবাদকেও মেনে নেননি। তিনি রাজকন্যা হিসেবে জন্মেছিলেন, মারা যান রানী হিসেবে। তবে প্রেমিকা নাকি ক্ষমতালিপ্সু কোনটায় তিনি বড় ছিলেন তিনি তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে।

Thursday, December 3, 2015

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন



জয়নুল আবেদিনের যেমন ছিলেন একজন শিল্পী তেমনি ছিলেন এদেশের আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ। তাঁর মানবিক গুণাবলির জন্যেও তিনি বিখ্যাত ছিলেন। প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল এক শিল্পী জয়নুল আবেদিন। শিল্পকলাকে কখনই তিনি সাধারণ জীবনের বাইরের কোন বিষয় বলে গণ্য করেননি। শিল্পের জন্য শিল্প এমন আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। আবার প্রপাগন্ডা আর্টেও তিনি বিশ্বাস করতেন না। শিল্প জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এটাই ছিল তাঁর দর্শন। তাঁর কাছে শিল্প হচ্ছে জীবনেরই এক প্রকাশ আর এর উদ্দেশ্য হলো মানব সমাজকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে তোলা। সমাজে সুন্দরের প্রতিষ্ঠার আগেই অবশ্য সেখান থেকে সব ধরনের কদর্যতা অপসারণ আবশ্যক। এসব কদর্যতার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও দৃশ্যমান অসমতা। জয়নুল তাঁর চার দশকের সুদীর্ঘ শৈল্পিক জীবনে একাগ্রভাবে শুধু সেই সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিবেশটিরই প্রতিষ্ঠায় নিবিষ্ট ছিলেন যার মাধ্যমে সম্ভব হয় অথপূর্ণ নন্দনচর্চার অব্যাহত প্রয়াস। তাঁর শিল্প সব সময়েই সাধারণ মানুষের কথা বলেছে। তিনি নিজেও উঠে এসেছেন তাদের মধ্য থেকেই। তাদের জীবন, তাদের অন্তহীন সংগ্রাম, তাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা সব কিছুই তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে তাঁর কাজের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ ও বাংলার নিসর্গ ছিল তাঁর অতি প্রিয় বিষয়।
জন্ম ও বংশ পরিচয়

জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সনের ২৯শে ডিসেম্বর বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। (সরকারি নথিপত্রে তাঁর জন্ম তারিখ অবশ্য ১৮ই নভেম্বর, ১৯১৪)। বাবার নাম তমিজউদ্দিন আহমেদ এবং মা জয়নাবুন্নেছা। বাবা ছিলেন পুলিশের সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর। তিনি ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র।
শিক্ষা জীবন ও শৈশব
.
ময়মনসিংহে তাঁর জীবনের শুরুতেই তিনি শৈল্পিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে বহু দূরের সেই শহর কলকাতায় গিয়ে শিল্পকলা শেখার দীর্ঘ এবং কঠিন ছাত্রজীবন শুরু না করা পযর্ন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। ১৯৩০ সালে বাড়ি থেকে পালিয়ে বন্ধুদের সাথে কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখতে যান। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সন পযর্ন্ত তিনি কলাকাতার সরকারি আর্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই স্কুলের সাধারণ পড়ালেখার পাট চুকিয়ে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এ ভর্তি হন। ১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং এ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্রহ্মপুত্র নদের প্লাবন অববাহিকার অত্যন্ত শান্ত সুনিবিড় ও রোমান্টিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শৈশব এবং তারুণ্যের প্রধানতম অর্জন ছিল বলতে গেলে এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের অভিজ্ঞতা। তাঁর শৈল্পিক মানসিকতা নির্মাণে প্রকৃতির প্রভাব ছিল অসামান্য ও সুদূরপ্রসারী। তিনি বলতে ভালোবাসতেন, নদীই আমার শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক।
শৈশবে তাঁর ওপর প্রকৃতির প্রভাব এবং কলকাতায় আর্ট স্কুলে ইউরোপীয় একাডেমিক বাস্তববাদী ধারার শিল্পাঙ্কন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ তরুণ জয়নুল আবেদিনকে গ্রামীণ নিসর্গশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। একাডেমিক ধারার সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও তিনি বিহারের সাঁওতাল পরগনা ও ময়মনসিংহের নিসর্গ দৃশ্যের ওপর বেশ কিছু স্মরণীয় স্কেচ এবং জলরং চিত্র এঁকেছেন।
কর্মজীবন
..
১৯৩৮ সালে শেষ বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত নর্মাল স্কুলে আর্ট শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং শ্বশুরালয় ১২ নম্বর আবদুল হাদী লেনে বসবাস করতে থাকেন।
১৯৪৮ সালে ঢাকাতে প্রদেশের প্রথম আর্ট স্কুল, গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস প্রতিষ্ঠার যাবতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। এতে তাঁর কয়েকজন শিল্পী সহযোগীও উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন। জয়নুল আবেদিন ইন্সটিটিউটের প্রথম প্রিন্সিপাল ডেজিগনেট হন এবং পাকিস্তানের রাজধানী করাচীতে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও প্রকাশনা বিভাগের মুখ্য নকশাবিদ হিসেবে যোগদানের জন্যে ৩রা আগস্ট, ১৯৪৮, করাচীর পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। করাচী থাকাকালীন সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজ, কায়েদে আজমের মাজারের পথে।
শিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা, তৎকালীন শিল্পী সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং কতিপয় বাঙালী সরকারী কর্মকর্তার সাহায্য ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়েই সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ সনে দেশের প্রথম আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা।তখন এর নাম ছিল গভর্মেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্ট পুরাতন ঢাকার জনসন রোডে অবস্থিত ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুল ভবনে দুটো কক্ষে গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস-এর ক্লাস শুরু হয় নভেম্বর মাসে। শিল্পী আনোয়ারুল হক অস্থায়ী প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৯ সালে ২৮শে ফেব্রুয়ারি তারিখে জয়নুল করাচী থেকে ঢাকায় ফেরেন এবং ১লা মার্চ ইন্সটিটিউটের প্রথম স্থায়ী প্রিন্সিপাল হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর অন্যতম উপদেষ্টা মনোনীত হন। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াস্থ কংগ্রেস ফর ওয়ার্ল্ড ইউনিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।
পারিবারিক জীবন
..
১৯৪৬ সালে জয়নুল আবেদিন ঢাকা নিবাসী তৈয়ব উদ্দিন আহমদের কন্যা জাহানারা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জয়নুল আবেদিন তিন পুত্রের জনক। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সাইফুল আবেদিন (টুটুল) স্থপতি। বর্তমানে তিনি আমেরিকা প্রবাসী। দ্বিতীয় পুত্র খায়রুল আবেদিন (টুকুন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল বিষয়ে এম.এ এবং কনিষ্ঠ পুত্র মঈনুল আবেদিন (মিতু) প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পানি-সম্পদ প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক।
১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ ও জয়নুল আবেদিন
.
তিনি ১৯৩৮ সনে নিখিল ভারত চিত্র প্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ পুরস্কার ছিল ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা তাঁর একগুচ্ছ জলরং ছবির জন্যে। এরপর আরো কিছুকাল পর্যন্ত জয়নুল আবেদিন প্রাকৃতিক পরিবেশেরই এক রোমান্টিক রূপকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তখন ছিলেন এক অরাজনৈতিক ব্যক্তি, একজন বিশ্বস্ত নিসর্গশিল্পী। কিন্তু ১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনকে একেবারে বদলে দেয়। গ্রাম-বাংলার রোমান্টিক নিসর্গশিল্পীকে রূপান্তরিত করে ফেলে এক দুর্দান্ত বিদ্রোহী ব্যক্তিত্বে। অতঃপর সারাটি জীবনই বিক্ষুব্ধ থেকে গেছেন তিনি।
দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পরপরই জয়নুল তাঁদের ময়মনসিংহের বাড়িতে ফিরে যান। সেখানেও দুর্ভিক্ষের যে মর্মান্তিক দৃশ্যাবলি দেখতে পান তাতে তিনি ভীষণভাবে ব্যথিত হন এবং আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। কিন্তু দুর্ভিক্ষপীড়িত দুস্থ মানবতা যেন সে যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হয়ে আসে। তেতাল্লিশের কলকাতা মহানগরে ঘটেছে মানবতার চরম অবমাননা। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট থেকে খাদ্যান্বেষণে তীব্র প্রতিযোগিতা চলেছে মানুষ আর কুকুরের মধ্যে। ঊনত্রিশ বছর বয়স্ক জয়নুল এ রকম অমানবিক দৃশ্যে প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত হন, আতঙ্কে শিউরে ওঠেন, আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কিন্তু সে আবেগ তিনি কাজে লাগান সেসব দৃশ্যাবলির শিল্পরূপ দিতে। অন্যভাবে বলা যায় সেই আবেগই তাঁকে তাড়িত করে, বাধ্য করে অমানবিক পরিস্থিতির এক মানবিক নির্মাণে। তিনি রাতদিন শুধু কলকাতার দুর্ভিক্ষের সেসব নারকীয় দৃশ্যাবলির স্কেচ করতে থাকেন।
জয়নুল তখন আর্ট স্কুলের একজন শিক্ষক, তাঁর আয় সামান্য। দুর্ভিক্ষের বাজারে উন্নতমানের শিল্পসামগ্রী তখন যেমন ছিল দুর্লভ তেমনি দুর্মূল্য। সে কারণে তিনি বেছে নেন শুধু কালো কালি আর তুলি। শুকনো তুলিতে কালো চীনা কালির টানে স্কেচ করতে থাকেন অতি সাধারণ সস্তা কাগজের ওপর। ব্যবহার করেছেন কার্টিজ পেপার। এসব কাগজ ছিল ঈষৎ পীত বর্ণের। এমনকি তিনি প্যাকেজিং কাগজও ব্যবহার করেছেন। সাধারণ স্বল্পমূল্যের এসব অঙ্কন সামগ্রী ব্যবহার করে তিনি যে শিল্প সৃষ্টি করলেন তাই পরিণত হলো অমূল্য সম্পদে। এমন এক অসাধারণ শক্তিশালী অঙ্কন শৈলীর মাধ্যমে তিনি দুর্ভিক্ষের করুণ বাস্তব দৃশ্যাবলি চিত্রায়িত করলেন, যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের চিত্রঐতিহ্যে ছিল না। জয়নুলের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো দেখার পর ভারতের নাইটিঙ্গেল শ্রীমতি সরোজিনি নাইডু মন্তব্য করেছিলেন, সব চাইতে মর্মস্পর্শী ও আবেগময় বর্ণনার চাইতেও তাঁর এসব ছবির আবেদন অধিকতর। সমসাময়িক এক শ্রদ্ধাভাজন শিল্পসমালোচক ছিলেন ও.সি. গাঙ্গুলী। ১৯৪৪ সনে তিনি জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ড্রইং সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁর এসব নির্মম তুলির টানের দুঃসাহসিকতার মধ্যে একাধারে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা ও সততা এবং তার সাথে আবার যুক্ত হয়েছিল আপোসহীন বাস্তবতা, যা কিনা বাংলার আধুনিক শিল্পীদের কাজে একেবারেই বিরল এক বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই অসাধারণ কাজের মাধ্যমে তিনি আধুনিক চিত্রকালার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করলেন। জয়নুলের ড্রইংগুলো ১৯৪৩-এর বাংলার ইতিহাসের ক্ষেত্রে এক অমূল্য বিশ্বস্ত দলিল হয়ে থাকলো। মানব জীবনের শোচনীয় পরিণতির মধ্যেও সৌন্দর্যের পূজারী হিসেবে এই শিল্পী বাংলার বিদ্যমান সস্তা ভাবপ্রবণ নিম্ন পর্যায়ের চিত্রধারাকে উন্নীত করলেন এক সম্মানজনক স্তরে। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো শুধুমাত্র সমাজ বাস্তবতার স্মারক হিসেবেই নয়; বরং যুগপৎভাবে এগুলোর শৈল্পিক উৎকর্ষতার জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। ও.সি. গাঙ্গুলির বস্তনিষ্ঠ মূল্যায়নের সাথে আমরা আরো যোগ করতে পারি ১৯৫২ সনে প্রদত্ত প্রখ্যাত বৃটিশ শিল্পসমালোচক স্যার এরিখ নিউটনের মন্তব্য, এগুলো অত্যন্ত চমৎকার ড্রইং, এগুলোর মধ্যে সেই অসম্ভব ব্যাপরটিই ঘটেছে, এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের।
তাঁর দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার মাধ্যমেই জয়নুল আবেদিন চিহ্নিত হলেন বাংলার শিল্পকলার প্রথম সমাজ বাস্তবতার শিল্পী হিসেবে। এটা অবশ্যই এক আশ্চর্য ঘটনা যে জয়নুলের আরেক সমকালীন মুসলমান, কাজী নজরুল ইসলামও মাত্র দুদশক আগে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন শোষিত নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠ হিসেবে তাঁর বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতার মাধ্যমে। নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী ছিলেন, রাজনৈতিক চেতনায় এবং তাঁর কাব্যে। তিনি বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ উচ্চকিত করেছেন আবার অন্যদিকে তৎকালীন কবিতায় প্রভাবশালী রাবীন্দ্রিক বলয় ভেঙেছেন। জয়নুল আবেদিনও তাঁর সমসাময়িক প্রতিপত্তিশালী ভারতীয় নব্য ধ্রুপদী ধারার চিত্র ধারার বাইরে অবস্থান করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এই ধারাটির প্রবর্তন করেছিলেন আবার ঠাকুর পরিবারের আরেক ব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবনীন্দ্রনাথের অত্যন্ত শীতল ও রীতিবদ্ধ নব্য ধ্রুপদী ধারা কিংবা বেঙ্গল স্কুলের চিত্রধারার চাইতে পাশ্চাত্যের বাস্তবতাভিত্তিক চিত্রধারাই প্রথম থেকে জয়নুল আবেদিনের অধিকতর পছন্দ ছিল। এরই ফলশ্রুতিতে দুর্ভিক্ষ নিয়ে চিত্রমালার শক্তিশালী বাস্তববাদী-প্রতীকী স্কেচগুলো বেরিয়ে এসেছে বলে মনে হয়।
বিদ্রোহী কবির মতোই জয়নুল আবেদিনও মানবতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে সে বছরই কলকাতায় যে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল তাতে জয়নুল তাঁর দুর্ভিক্ষ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপত্র The Peoples War পত্রিকায় ১৯৪৫ সনের ২১শে জানুয়ারি সংখ্যায় জয়নুলের ওপর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে জয়নুলকে এক তরুণ বাঙালি মুসলমান হিসেবে পরিচয় করানো হয়। সাথে ছিল তাঁর একটি ফটোগ্রাফ এবং দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার তিনটি ছবির প্রতিলিপি। কাগজটি তাঁর সম্বন্ধে লিখেছিল, বাঙলার ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘের একজন সদস্য জয়নুল। এই সংঘটি সমগ্র বাংলার সকল শিল্পী ও লেখকের এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান যার প্রধান কর্তব্যই ছিল সমস্যাতাড়িত জনগণকে সাহায্য করা। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সে সকল সময়েই এঁদেরই একজন অগ্রণী সদস্য থাকবে। জয়নুল সম্পর্কে পত্রিকাটির মূল্যায়ন বস্তুতই অত্যন্ত সঠিক ছিল একথা পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে।
শিল্প আন্দোলনের কর্ণধার

১৯৪৭ সনে উপমহাদেশে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলো, তারপর জয়নুল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্যতম প্রদেশ পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে তাঁর চাকরিটি ছেড়ে ঢাকায় এসে নর্মাল স্কুলের অঙ্কন শিক্ষকের কাজ পান। কিন্তু তখন থেকেই তিনি এদেশে শিল্প আন্দোলন শুরুর গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবায় তাঁর এই উদ্যোগটি ছিল রীতিমতো বিপ্লবাত্মক ঘটনা। তাঁর শিল্পী হিসেবে খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা, তৎকালীন শিল্পী সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং কতিপয় বাঙালি সরকারি কর্মকর্তার সাহায্য ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়েই সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ সনে এদেশের প্রথম আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা। তখন এর নাম ছিল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস। এই ইনস্টিটিউটকে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষরূপে। মাত্র দুকামরার সেই ইনস্টিটিউটটিকে ১৯৫৬ সনের মধ্যেই তিনি এক অতি চমৎকার আধুনিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করেন। পরবর্তীকালে এটি পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় এবং স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। (আরো পরে মহাবিদ্যালয়টি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তান্তরিত হয় এবং এর বর্তমান পরিচয় চারুকলা ইনস্টিটিউট নামে)। কলেজ ক্যাম্পাসের নকশা নির্মাণে জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্থপতি মাজহারুল ইসলামকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। চারুকলা কলেজ/ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসের যে নান্দনিকতা তা এদেশের ক্যাম্পাস স্থাপত্যের এক মানদণ্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে ১৯৫১-৫২তে জয়নুল আবেদিন সরকারি বৃত্তি নিয়ে এক বছরের জন্যে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন চারুকলা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। তিনি তাঁর নিজের শিল্পকর্মের প্রদর্শনীও করেন। তাঁর কাজ ইংল্যান্ডের বিদগ্ধজনের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর এই ইংল্যান্ড ভ্রমণটি শুধুমাত্র যে তাঁকে পাশ্চাত্য জগতে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাই নয়, এতে করে তাঁর দৃষ্টি আরো প্রসারিত হয় এবং সম্ভবত এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের চারুকলা চর্চা শুরু থেকেই এক প্রাণবন্ত আধুনিকতার চরিত্র গ্রহণ করতে পেরেছিল। আবেদিনের এই ইউরোপ ভ্রমণ তাঁকে বাংলার সমৃদ্ধ লোকশিল্পের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কেও বিশেষভাবে সচেতন করে তোলে। জয়নুল তাঁর ছাত্রাবস্থায় ও তারুণ্যে যদিও অবনীন্দ্রনাথের নব্য-ধ্রুপদী ধারা কিংবা যামিনী রায়ের বাংলার লোক-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ শিল্পশৈলীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না, তবে ৫২তে বিলেত থেকে ফিরে এসে তিনি এদেশের স্থানীয় শিল্প-ঐতিহ্যের সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্প-আন্দোলন ও কৌশলাদির সমন্বয় সাধনে ব্রতী হন। ইতিমধ্যে তিনি নানান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। তৎকালীন বিদ্যমান রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি থেকেই তিনি বাঙালি সংস্কৃতির ওপর বৈরী পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্যবাদী মনোভাব সম্পর্কে সচেতন হন। তিনি তখন থেকেই চিত্রকলায় এক ধরনের আধুনিক বাঙালিত্ব ফুটিয়ে তোলার পক্ষে সুস্পষ্ট ও জোরালো মত ব্যক্ত করতে থাকেন। তাঁর এই মানসিকতা তাঁর নিজের কাজের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৫১ সনে এবং এর অব্যবহিত পরে আঁকা তাঁর ছবিতে একটি অসাধারণ আঙ্গিকের পরিচয় পাওয়া যায়। এই আঙ্গিকের প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা যায়, জয়নুল গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ প্রাত্যহিক অথচ অত্যন্ত প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন দৃশ্যাবলি এঁকেছেন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার সেই তুলির বলিষ্ঠতা ও সাবলীলতা আবার প্রাণ পেয়েছে এ সময়ের কাজে। অধিকাংশ কাজ জলরং বা গোয়াশে করা। ব্যবহৃত জলরংঙের বৈশিষ্ট্য হালকা এবং অনুজ্জ্বল, তুলির টান এবং কম্পোজিশন বা স্পেস ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচ্যধর্মী। অন্যদিকে বিষয় উপস্থাপনা ও ড্রইং পাশ্চাত্য-বাস্তবধর্মী। এভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এক অপরূপ সমন্বয় ঘটেছে তাঁর শিল্পকর্মে। তাঁর ঝড় শীর্ষক ছবিটি এক অসাধারণ কাজ। এতে বাংলাদেশের কালবৈশাখীর আকস্মিকতা ও উদ্দামতা ধরা পড়েছে অতি চমৎকারভাবে। বিন্যাসের সংক্ষিপ্ততায় ছবিটি আকর্ষণীয়। একইভাবে আরেকটি সুন্দর জলরং ছবি মই দেয়া। তবে এই সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্ভবত মাঝারি সাইজের একটি জলরং, যার শিরোনাম বিদ্রোহী। পরবর্তী সময়ে এটি একটি প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। একটি অবাধ্য গাভী ষাড়ের মতো প্রচণ্ড শক্তিতে তার বাঁধন ছিঁড়ে ছুটে যাচ্ছে। তুলির টানের শক্তি ও সাবলীলতা অসাধারণ। ক্ষিপ্রতার সাথে আঁকা হলেও ছবিতে বিভিন্ন অংশের সূক্ষ উপস্থাপনায় চরম মুন্সিয়ানা ধরা পড়ে। পাকানো দড়ি কিংবা গরুটির পায়ের খুর, এসবের ডিটেলস লক্ষণীয়। এই আঙ্গিকে তিনি ছবি এঁকেছনে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে। সুগঠিত সুন্দর সাঁওতাল নরনারীকে বিষয় করে চিত্তাকর্ষক ছবিও এঁকেছেন।
এর পরপরই ৫২-৫৩তে জয়নুল গড়ে তোলেন এক চমৎকার নতুন ঢং, যাকে আধুনিক বাঙালি ঢং বলা চলে। এই ঢঙের কাজের সাথে যামিনী রায়ের ছবির ঢঙের সামঞ্জস্য দেখা যায়। জয়নুলের এই ঢঙের কাজে বাংলার লোক-শিল্পের নানা মটিফ এবং রং বিন্যাসের প্রভাবও লক্ষণীয়। তাঁর এ সময়ের কাজগুলোকে রোমান্টিক মেজাজের বলে চিহ্নিত করা যায়। বছর কয়েক আগে জয়নুল বিয়ে করেছেন, তাঁর সন্তানদের জন্ম হয়েছে এরই মাঝে। তাঁর ঢঙের ছবি সবই অবয়বভিত্তিক, তবে তাঁর এই ঢঙের ছবি সবই অবয়বভিত্তিক, তবে তাঁর নিজস্ব নতুন আঙ্গিকেই উপস্থাপিত। আধাবিমূর্ত, জ্যামিতিক ফর্মে নির্মিত হয়েছে মানব-মানবীর শরীর। অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত পারসপেকটিভের শর্ত মানা হয়নি। জলরং, গোয়াশ এবং তেলরং, নানা মাধ্যমে আঁকা ছবির এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল প্রাথমিক রঙের ব্যবহার। ছবিগুলো আকারে আয়তনে ছোট বা মাঝারি। অধিকাংশ ছবি মহিলাদের জীবনযাপন নিয়ে, এসব ছবিতে পল্লী-রমণীগণ নদীর ঘাটে যাচ্ছে জল আনতে বা স্নান করতে। অনাবিল প্রশান্তিতে প্রসাধানে নিযুক্ত, একক, যুগল কিংবা ত্রয়ী মহিলার চিত্র। মা ও শিশুও রয়েছে। গ্রামীণ কর্মী পুরুষের জীবনও ধরা পড়েছে এই সময়কার কাজে। একটি গোটা সিরিজ গড়ে উঠেছে এসব ছবি নিয়ে। এগুলোর মধ্যে কিছু স্মরণীয় কাজ হলো নৌকোর গুণটানা, পল্লী-রমণী, আয়না নিয়ে বধূ, একাকী বনে, পাইন্যার মা, মা ও শিশু, তিন পল্লী রমণী, মুখ চতুষ্টয় ইত্যাদি।
জয়নুলের এই আধুনিক বাঙালি রীতির কাজগুলো দেখে একজন বৃটিশ শিল্পসমালোচক, রিচার্ড উইলসন, ১৯৫৫ সনে লিখেছেন, এক হিসেবে বলতে হয় তাঁর এসব কাজ পাক-ভারতীয় চিত্রকলার আধুনিক যুগে উত্তরণের সূচনা করেছে। ভারত ও পাকিস্তানের তিনিই প্রথম শিল্পী যিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে বিমূর্ত চিত্রকালার টেকনিক ও স্থানীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন, অনুকরণের ওপর মোটেও গুরুত্ব দেননি।
সংগ্রামী জয়নুল
..
জয়নুল আবেদিন অবশ্য তাঁর এই শিল্প আঙ্গিকটি খুব বেশি দিন ধরে রাখেননি। পঞ্চাশ দশকের শেষ ভাগেই তিনি বরং ফিরে যান তাঁর প্রথম পযার্য়ের বাস্তবধর্মী আঙ্গিকে যার বৈশিষ্ট্য ছিল গতিময় ও শক্তিশালী রেখা। মাঝে মধ্যে তিনি বিমূর্ত প্রকাশবাদী আঙ্গিকে কিছু ছবি এঁকেছেন তবে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য ছিল বাংলার খেটে খাওয়া কর্মীমানুষের জীবন সংগ্রামের ছবি আঁকাতেই। ১৯৫৯ সনে আঁকা সংগ্রাম শিরোনামে তাঁর বিশাল তেলরঙের একটি কাজ এই ধারারই প্রতীক। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে গরুর গাড়ির এক চালককে প্রাণপণ শক্তিতে কাদার মধ্যে আটকে পড়া তার গাড়িটিকে ঠেলে তুলতে। চালকের এই সংগ্রাম, এক নিঃসঙ্গ একক মানুষের সংগ্রাম। এ যেনো সিসিফাসের সংগ্রাম। এ সংগ্রামের কোন শেষ নেই।
১৯৬৯ সনের গণ-আন্দোলন তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। স্বৈরশাসনের শুরু ১৯৫৮ সনের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। বাংলাদেশে (অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবিই ছিল গণ-আন্দোলনের মূল কথা। তখন এদেশের চিত্রশিল্পীরাও জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন এবং ১৯৭০ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে আর্ট কলেজে নবান্ন শীর্ষক এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। আপাদমস্তক এক বাঙালি জাতীয়তাবাদী, জয়নুল, বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। শহীদ মিনারের সামনে প্রদর্শনের জন্যে তিনি ব্যানার এঁকেছেন, ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলোর জন্যে প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছেন, লিখেছেনও এগুলোতে, আর মিছিলেও তিনি অংশ নিয়েছেন। এমনকি তিনি জননেতা মাওলানা ভাসানীর সাথে ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় ভাষণও দিয়েছেন। এভাবে দেখা যায় জয়নুল ছিলেন তাঁর সমকালীন মেক্সিকোর শিল্পী ডেভিড সিকিওরসের ভাষার সেই বিপ্লবী সমাজবাদী শিল্পী। উল্লেখ্য, সিকিওরসের সাথে জয়নুলের দেখা হয়েছিল সিকিওরসের দেশ মেক্সিকোতে। জয়নুল ১৯৫৬-৫৭ সালে বিশ্ব ভ্রমণের এক পর্যায়ে মেক্সিকো বেড়াতে গিয়ে সিকিওরসের সাথে দেখা করেন।
১৯৬৮ সনের নবান্ন প্রদর্শনীতে এরই জন্যে বিশেষভাবে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি স্ক্রল চিত্র নিয়ে নেতৃত্ব দেন জয়নুল আবেদিন। স্ক্রলের কাগজের প্রস্থ ছিল ৪ফুট। কালো চীনা কালি, জলরং আর মোম ব্যবহার করেছেন স্ক্রলটি আঁকতে। এই চিত্রমালায় তিনি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস। সোনার বাংলা-র সুখ ও শান্তির দিনের চিত্র দিয়ে শুরু, তারপর ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলার ক্রম-নিঃস্বতার পরিণতি, চরম দারিদ্র্যাবস্থা, দুর্ভিক্ষ এবং অবধারিতভাবে দুঃখী দরিদ্র মানুষের গ্রামত্যাগী হয়ে শহরমুখী যাত্রা। এ এক মহা আলেখ্য।
স্পর্শকাতর দৃশ্যাবলি, হৃদয় স্পর্শী উপস্থাপনা, অত্যন্ত সহজ সরল আঙ্গিক ও ঢং অথচ অসাধারণ তার আবেদন। হাজার হাজার মানুষ নবান্ন প্রদর্শনীতে এসে এই ছবি দেখেছে। পরে তাঁর শান্তিনগরের বাড়িতে গিয়েও অনেকে দেখেছে। তাঁর বাড়ি ছিল যেনো এক খোলামেলা জাদুঘর। সবার ছিল অবারিত প্রবেশাধিকার। তিনি দর্শকদের উৎসাহ দিতেন নবান্ন দীর্ঘচিত্রের এক প্রান্তে তাঁদের নিজের নাম সই করতে। অসংখ্য দর্শক তাদের নামের স্বাক্ষর রেখেছে ছবিটিতে। এভাবে তিনি মানুষকে তাঁর শিল্পকলার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এদের মধ্যে যেমন ছিলেন দেশ ও বিদেশের নামিদামি মানুষ, তেমনি ছিল বাংলার সাধারণ মানুষ।
জয়নুল আবেদিন ছিলেন মুক্তিকামী মানুষ। স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্যে যাঁরা সংগ্রাম করেন তাঁদের সবার সাথেই একাত্মতা জানাতে উৎসাহী ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সনে যখন তাঁর বয়স প্রায় ৫৬, তিনি আরব লীগের আমন্ত্রণে ছুটে যান মধ্যপ্রাচ্যের সমর ক্ষেত্রে। আল-ফাতাহ গেরিলাদের সাথে চলে যান যুদ্ধফ্রন্টে। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকেন, তাঁর সেসব ছবির প্রদর্শনী হয় একাধিক আরব দেশে। মুক্তিযোদ্ধারা তাতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
প্যালেস্টাইন থেকে দেশে ফিরতে না ফিরতে জয়নুলের নিজের দেশেই এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় আঘাত হানে দেশের উপকূলীয় এলাকায়। তিন লক্ষাধিক মানুষ এই ঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়। প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খান জয়নুল আবেদিন। কিন্তু বসে না থেকে একটি রিলিফ টিমের সাথে ছুটে যান দুর্যোগাক্রান্ত এলাকায়। দুঃখী জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। পরে তিনি সেখানকার মর্মস্পর্শী দৃশ্যাবলির কিছু কিছু তুলে ধরেন তাঁর তুলিতে, কালিতে। নবান্ন আঙ্গিকেই আকেঁন আবার একটি দীর্ঘচিত্র বা স্ক্রল। মনপুরা ৭০ শীর্ষক এই স্ক্রলটি ছিল ৩০ ফুট দীর্ঘ। কালো কালি এবং মোম সহযোগে আঁকা হয়েছে স্ক্রলের ছবি। এতে দেখানো হয়েছে স্তূপীকৃত লাশের দৃশ্য। এ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে জয়নুল দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলতেন আমরা শুধু মৃত্যুতেই একতাবদ্ধ হই । তবে স্ক্রলটির একেবারে শেষ প্রান্তে শিল্পী স্থাপন করেন এক বলিষ্ঠ পুরুষকে। এখনো জীবিত এবং মাথা নিচু করে বসে আছে ধ্বংসস্তূপ থেকে বাঙালির সম্ভাব্য পুনরুত্থানের প্রতীক হিসেবে।
সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সেরে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নিজ দেশে বন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন জয়নুল। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালেন কিন্তু সবর্ক্ষণই তাঁর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা আঁকড়ে ধরে রাখলেন।
মুক্তিযুদ্ধ জয়নুলের মনে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিজয় অর্জনের পর পরই তিনি পুর্ণোদ্যমে লেগে যান শিল্পচর্চা সংগঠনের কাজে। এবারে লোকশিল্প তাঁর কাছে প্রাধান্য পেতে থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জয়নুল আবেদিনকে দায়িত্ব দেন বাংলাদেশের সংবিধানটির অঙ্গ সজ্জার জন্যে। তিনি প্রবল উৎসাহের সাথে কাজটি সমাধা করেন। তাঁকে সাহায্য সহযোগিতা করেন আরো কয়েকজন শিল্পী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক সংকট তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করে। তাঁর কর্মচাঞ্চল্যে কিছুটা ভাটা পড়তে থাকে। তাঁর মন খারাপ হতে থাকে। সুপুরুষ স্বাস্থ্যবান দীর্ঘদেহী জয়নুলের স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। তিনি যেন বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি ছুটলেন তাঁর আজীবন লালিত স্বপ্ন লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজে। তাঁর ইচ্ছে ছিল এই জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে দেশের মূল্যবান লোকশিল্প, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখান থেকেই নতুন প্রেরণা পাবে। জয়নুল তাঁর নিজের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্যেও একটি চিত্রশালা প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছেন। এসব কাজের মন্যে সরকার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছিলেন। প্রয়োজনীয় কিছু অর্থ মঞ্জুরিও দিয়েছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করে এ দুটো প্রতিষ্ঠানেরই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার শুরুটা তিনি তাঁর মৃত্যুর আগেই দেখে যেতে পেরেছেন।
দীর্ঘ ছমাস ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সরকার দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীর চিকিৎসার জন্যে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মাত্র ৬২ বছর বয়সেই তাঁর জীবনাবসান হলো। অবশ্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আঁকার কাজ অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৬ সনের ২৮শে মে তারিখে তাঁর মৃত্যুর মাত্র কদিন আগে হাসপাতালে শুয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব ঢঙে শেষ ছবিটি আঁকেন, দুটো মুখ, বলিষ্ঠ মোটা রেখায়, কালো কালি আর মোম ব্যবহার করে।
সোনারগাঁও-এ লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠা
.
জয়নুল আবেদিনের ঐকান্তিক প্রচেস্টায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প জাদুঘর স্থাপিত হয়। এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব রয়েছে। ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সোনারগাঁও একসময়ে বাংলার অন্যতম রাজধানী শহর ছিল। মোঘল আমলে এই অঞ্চল প্রসিদ্ধ ছিল মসলিম কাপড় তৈরির কেন্দ্র হিসেবে। এখনো এ অঞ্চলে সুন্দর সুন্দর হাতের কাজ হয়, তাঁতের কাপড় তৈরি হয়।
নিজস্ব সংগ্রহশালা
..
জয়নুল আবেদিনের জন্ম সাধারণ পরিবারে। তিনি জীবনযাপনও করেছেন সাধারণ বাঙালির মতোই। সরল কিন্তু আত্মবিশ্বাসী জয়নুল সমাজের শক্তিধর ব্যক্তিত্ব এবং দরিদ্র চাষী সবার সাথেই অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দে মেলামেশা করতে পারতেন। তারাও যেনো তাঁকে আপন মানুষ মনে করতেন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মজলিশি মানুষ, অক্লান্ত আড্ডা দিতে পারতেন। তাঁর কথা বলার ভঙ্গিটি ছিল একেবারেই নিজস্ব ও অননুকরণীয়। ময়মনসিংহের আঞ্চলিকতার টান ছিল ভাষায়। তিনি ছিলেন যেমন আমুদে, তেমনি রসিক। তিনি ভালোবাসতেন শিশুদের, ভালোবাসতেন ভালো খাবার, বিশেষ করে গ্রামবাংলার খাবার। তিনি ছিলেন চা প্রেমিক এবং ধূমপানে আসক্ত। নিরবচ্ছিন্নভাবে সিগারেট খেতেন। এই অভ্যাসই হয়তো শেষে তাঁর কাল হয়েছিল। তিনি প্রকৃতির সবকিছুই ভালোবাসতেন, শুধু কাক পছন্দ করতেন না। অথচ কাকের ছবিই বার বার তাঁর হাতের তুলির পরশে কী জীবন্ত রূপ পেয়েছে। তাঁর কাছে কাক ছিল সুযোগ সন্ধানী চালাকদের প্রতীক।
জয়নুল তাঁর নিজের ছবির গ্যালারির স্থান নির্বাচন করেন ময়মনসিংহে তাঁর অতি প্রিয় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের একটি পুরাতন ভবনে। এটাই তাঁর জন্যে স্বাভাবিক ছিল। ময়মনসিংহ তাঁর নিজের জেলা।১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানকার নৈসর্গিক পরিবেশই গড়ে তুলেছিল তাঁর শিল্প মানস, এখানকার জেলা বোর্ডই কলকাতায় তাঁর শিল্পকলা শিক্ষাকালের প্রথম পর্যায়ের অতি জরুরি বৃত্তিটি দিয়ে তাঁকে উৎসাহিত করেছিল। তাঁর মা নিজের গলার হার বিক্রি করে সেই দূরের অচেনা শহর কলকাতায় ছেলেকে আর্ট স্কুলে পড়তে যেতে সাহায্য করেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন ময়মনসিংহে কর্মরত ছোট দারোগা। অনেক কষ্টে তিনি ছেলের জন্যে মাসে মাত্র দশটি টাকা পাঠাতে পারতেন। সেই তিরিশের দশকেও এটা খুব সামান্য পরিমাণ টাকাই ছিল। তখন ময়মনসিংহ জেলা বোর্ড আর্থিক সাহায্য না করলে প্রায় অসম্ভব হতো জয়নুলের শিল্প-শিক্ষা গ্রহণ। কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল দে-র জোর সুপারিশে কাজ হয়েছিল। জেলা বোর্ড জয়নুলকে মাসিক পনেরো টাকা করে বৃত্তি অনুমোদন করেছিল। এতে করে আর্ট স্কুলের জীবনটা তাঁর কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত হয়েছিল।
জয়নুল আবেদিন তাঁর এসব ঋণের কথা ভোলেননি কখনও। সুযোগ পেলেই ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করেছেন। তিনি যখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তখন থেকেই জয়নুল পত্র-পত্রিকার অঙ্গসজ্জা করে যে সামান্য আয় করতেন তা দিয়েই তাঁর পিতার অস্বচ্ছল পরিবারে আর্থিক অবদান রেখেছেন। তাঁর মাকে দিয়েছেন শুধু ভালোবাসা। তাঁর জন্মস্থান ময়মনসিংহকে উপহার দিয়েছেন একটি আর্ট গ্যালারি আর বাংলাদেশের জনগণকে দিয়েছেন তাঁর সারা জীবনের শিল্পকর্মের বৃহৎ সম্ভার। এসবের মধ্যে মহামূল্যবান দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার অধিকাংশ স্কেচও রয়েছে। তাঁর এই শিল্পসম্ভার বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জয়নুল গ্যালারিতে সংরক্ষিত।
পুরস্কার ও সম্মাননা
১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ড, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করেন। লন্ডনের স্লেড স্কুল অব আর্টস-এ কাজ করেন এবং তখন রয়েল ইন্ডিয়া, পাকিস্তান এ্যান্ড সিলোন সোসাইটির উদ্যোগে তাঁর পেইন্টিং এবং ড্রইং-এর এক প্রদর্শনী হয় (৩-৮ ডিসেম্বর, ১৯৫১)। লন্ডনের বার্কলী গ্যালারিতে পেইন্টিং এবং ড্রইং-এর প্রদর্শনী (১৪-২৬) জানুয়ারি, ১৯৫২)। এই প্রদর্শনীর আয়োজক ছিলেন লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনার। এরিখ নিউটন প্রমুখের প্রশংসা। বেলজিয়াম, প্যারিস, আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী। ইউনেস্কো আয়োজিত ও ভেনিসে আর্ট কনফারেন্সে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের লাহোর শহরের আলহামরায় (১৪-২১ সেপ্টেম্বর) প্রদর্শনী, আয়োজক ছিল লাহোরের মেয়ো স্কুল অব আর্ট এবং পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল।
১৯৫৫ সালে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলে আয়োজিত করাচীতে তাঁর চিত্রকলার প্রদর্শনী। জাপানের টোকিও শহরে দামারু গ্যালারিতে সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী (অক্টোবর)। আয়োজক জাপানিজ ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন এবং মাইনিচি পাবলিকেশন্স। ১৯৫৬ সালে রকফেলার ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে বর্ষব্যাপী বিশ্ব ভ্রমণে যান এবং জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং ইউরোপ ভ্রমণ করেন। ১৯৫৭ সালের ৮-২৯ এপ্রিল ওয়াশিংটন ডিসির স্মিথরোনিয়ান ইন্সটিটিউশনে তাঁর ৫২টি চিত্রকর্মের প্রদর্শনী করেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সৃজনশীল কাজের জন্যে দেশের সর্বোচ্চ পদক প্রাইড অব পারফরমেন্স লাভ করেন। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক হিলাল-ই-ইমতিয়াজ শীর্ষক বেসামরিক উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৬১ সালে সোভিয়েত সরকার কর্তৃক আমন্ত্রিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন এবং সেখানে তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। ১৯৬৫ সালে পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চারুকলা বিভাগ খোলার জন্যে সে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে সাতমাস কাটান এবং বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৬ সালে ইরানের তেহরানে আরসিডি দেশসমূহের (পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক) দ্বিবার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীতে বিচারকর্মগুলীর সদস্য হিসেবে কাজ করেন।
১৯৭০ সালে আরব লীগের আমন্ত্রণে মধ্যপ্রাচ্য সফরে যান এবং ফাত্তাহ গেরিলা মুক্তি যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করার জন্যে গেরিলা যোদ্ধাদের ওপর আঁকা তাঁর ছবির প্রদর্শনী করেন বিভিন্ন আরব শহরে। ১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে জননেতা মাওলানা ভাসানী আয়োজিত ময়মনসিংহের এক জনসভায় জয়নুল ভাষণ দেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত বাঙালিদের অসহযোগ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণার প্রতীক হিসেবে হিলাল-ই-ইমতিয়াজ উপাধি বর্জন করেন।
১৯৭৩ সালে ভারতে বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রদর্শনী উপলক্ষে শিল্পীদলের নেতৃত্ব দান করেন। ১৯৭৪ সালে ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ভারত পরিভ্রমণ করেন। এবছরই তিনি ভারতের দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানজনক ডি লিট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে সে দেশ ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশে চারুকলার উন্নয়নে জয়নুল আবেদিন তাঁর অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি পেয়েছেন শিল্পাচার্য সম্বোধনে। এ শিরোপা তাঁকে উপহার দিয়েছে তাঁরই দেশের গুণমুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ জনগণ।
আজীবন জয়নুল আবেদিন ছিলেন জনগণের শিল্পী এবং জনগণেরেই মানুষ। আবার তাঁকেই দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়ক এবং পণ্ডিতগণ অতি উঁচু দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর অসাধারণ শিল্প-প্রতিভা এবং তাঁর মহৎ মানবিক গুণাবলির জন্যে তিনি বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন, সরকার এবং জনগণের কাছ থেকে পেয়েছেন সম্মান। রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন।