Thursday, December 17, 2015

আপনি কি এই মুহুর্তে কোন ভাবে হিপনোটাইজড?

আমার কথাবার্তার যে ভঙ্গি, তাতে
যদি কোন মহা মনীষীর কোন একটা
সিরিয়াস তত্বও কাউকে বুঝিয়ে বলতে
থাকি। বিরক্ত হয়ে সে ভাবে, আমি
মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে হাসি
তামাশা করছি। একারণেই অনুবাদ
আমাকে দিয়ে ঠিক হয়না। কিন্তু একটা
কাজ হয়না বলে তো আর ক্ষান্ত
দেওয়ার লোক আমিনা। আর আমার
অভিজ্ঞতা বলে, হাসিতামাশাও
অনেকে পছন্দ করে। মানে আমি নিজে
অন্তত করি। তাই এই অনুবাদ প্রচেষ্টা।
কিছুনা হোক প্রাকটিস তো হোক।
আরো অনেক বিজ্ঞানীর মত ফাইনম্যান
আমার প্রিয় একজন। তবে বেশ কিছু
কারণে আমি ফাইনম্যানের একটু বেশিই
ফ্যান। কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রো
ডাইনামিক্স এবং কোয়ান্টাম
কম্পিউটেশনের জনক। তার একটা দারুণ বই
আছে “শিওরলি ইউ আর জোকিং
মিস্টার ফাইনম্যান” নিজের
ছাত্রজীবনের বিভিন্ন মজার বিষয়
নিয়ে লেখা। ইস্নিপ্সের কল্যানে
সেটা হাতে পেয়েছি। এই মহান
বিজ্ঞানী যে কতটা মজার একজন মানুষ
তা বোঝা যায় এই বইএ। ক্যালটেকে
দেওয়া তার পদার্থবিজ্ঞানের
লেকচার নিয়ে তিন ভলিউমের একটা
বই আছে। " দি ফাইনম্যান লেকচার অন
ফিজিক্স ” সেই বইএর কিছু কিছু অংশ
অনুবাদ করার ইচ্ছা আছে শিঘ্রই। সেজন্যই
আজকের এই প্রাকটিস ম্যাচ। ফাইনম্যান
কে পছন্দ করার একটা কারণ হচ্ছে তার
একটা বিশ্বাস। সে বিশ্বাস করত ‘আমি
যদি একটা প্রথম বর্ষের ছাত্র কে পদার্থ
বিজ্ঞানের কোন একটা বিষয়, তা যত
অ্যাডভান্সডই হোক না কেন, বুঝিয়ে
বলতে না পারি তাহলে আমি নিজেই
সেটা বুঝিনি’। তাই তার
লেকচারগুলো খুবই সুখপাঠ্য এবং বোধগম্য।
আজকের এই অংশ ‘শিওরলি ইউ আর
জোকিং মিস্টার ফাইনম্যান’ থেকে
নেওয়া “Meeeeeeeeeee!” নামক অনুচ্ছেদের
অনুবাদ। এই অনুচ্ছেদে হিপনোটিজম
নিয়ে মজার কিছু ঘটনা আছে। তবে একটু
খেয়াল করলেই আমরা একটা দারুণ
জিনিস শিখে নিতে পারি এখান
থেকে। পড়ার আগে জেনে রাখা ভাল
যে প্রিন্সটনে গ্রাজুয়েট ছাত্র অবস্থায়
ফাইনম্যান তার প্রচন্ড মেধা আর দারুণ
দুষ্টুমির জন্য পুরো ভার্সিটিতে
সুপরিচিত ছিলো। অনুবাদ শুরু হল:
আমিইইইইইইইইইইই!
প্রতি বুধবারে প্রিন্সটন গ্রাজুয়েট
কলেজে বিভিন্ন লোক এসে নানা
বিষয়ে লেকচার দিত। বেশিরভাগ
বক্তারাই হত ইন্টারেস্টিং স্বভাবের।
তাই লেকচারের শেষে আলাপ
আলোচনার সময় তাদের সাথে অনেক
মজা হত। যেমন এক বক্তা ছিলো আন্টি -
ক্যাথলিক। প্রতি বক্তৃতার আগে সে
আমাদের হাতে বিভিন্ন প্রশ্ন ধরিয়ে
দিত। যাতে আমরা সেসব প্রশ্ন করে
কোন ধর্মগুরু(বক্তা) কে জ্বালাতে
পারি। আমরা এই লোককেও অনেভাবে
যন্ত্রনা দিতাম।
আরেকবার একজন বক্তৃতা দিল কাব্যের
উপর। তার বিষয় ছিল কবিতার গঠন আর
তার সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন আবেগ
নিয়ে। বক্তৃতার মধ্যে সে কবিতার
আবেগিক সংগঠন সমুহকে বেশ কয়েকটি
নির্দিষ্ট শ্রেনীতে ভাগ করে ফেলল!
তারপর বক্তৃতার শেষে আলোচনার সময়
বলল, “ব্যপারটা ঠিক গণিতের মত। তাই
না, ডক্টর আইজেনহার্ট?”
ডক্টর আইজেনহার্ট ছিলেন গ্রাজুয়েট
কলেজের ডীন এবং একজন গণিতের
প্রফেসর আর বেশ চালাক চতুর স্বভাবের।
প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে তিনি বললেন,
“আমি বরং জানতে চাইবো ফাইনম্যান
এটাকে তাত্বীক পদার্থবিজ্ঞানের
সাপেক্ষে কিভাবে দেখে”। সে
প্রায়ই চালাকি করে এধরণের
পরিস্থিতি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে
দিত।
আমি সিরিয়াস ভঙ্গিতে উঠে
দাঁড়িয়ে বললাম, “হ্যাঁ, এরা আসলেই
খুবই কাছাকাছি সম্পর্কিত। যেমন
কবিতার মত তাত্বিক পদার্থ
বিজ্ঞানে শব্দের বদলে আছে
গাণিতিক সূত্র, আর সেখানে কবিতার
সঙ্গঠনের সদৃশ হচ্ছে তাত্বীয়...
এটাসেটা এবং এইসেই...” এভাবে
অনেক্ষন বকবক করে আমি দুইটা
জিনিসের মধ্যে একটা নিখুদ সদৃশ
টানলাম। সেই বক্তা ততক্ষনে খুশিতে
জ্বলজ্বল করছে।
এরপর আমি বললাম, “আমার মনে হয় আপনি
কবিতা সম্পর্কে যাই বলেন না কেন,
আমি ঠিকই যে কোন বিষয়ের সাথে
তার একটা সদৃশ টানতে পারব। যেভাবে
তাত্বীক পদার্থবিদ্যার সাথে
টানলাম এখন। আমার কাছে এধরণের
সাদৃশ্যের কোন মানে নেই।
রঙীন কাচের জানালা ওয়ালা একটা
বড়ো ডাইনিং হলে আমরা প্রতিদিন
খেতাম, প্রতি খাওয়ার শুরুতে ডীন
আইজেনহার্ট ল্যাটিন ভাষায় ছোট্ট
একটা প্রার্থনা করত। মাঝে মাঝে
ডীনার শেষে সে উঠে দাঁড়িয়ে কোন
একটা ঘোষনা দিত। যেমন এক রাতে
দাঁড়িয়ে বলল, “দুই সপ্তাহ পরে একজন
মনস্তত্ব বিদ্যার অধ্যাপক আসবেন
বশীকরণের উপর বক্তৃতা দিতে। এখন এই
প্রফেসর মনে করেন বক্তৃতাটা আরো
ভালো হবে যদি তিনি হিপনোসিস
সম্পর্কে শুধু মুখে না বলে সবার সামনে
কাউকে হিপনোটাইজ করে দেখান।
তাই তার হিপণোটাইজড হতে ইচ্ছুক, এমন
কিছু ভলেন্টিয়ার লাগবে”।
এই খবর শুনে আমি রীতিমত উত্তেজিত
হয়ে গেলাম। হিপনোটাইজ হতে না
চাওয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা। ব্যপারটা
নিশ্চই দারুণ কিছু হবে!
ডীন আইজেনহার্ট বলতে থাকলেন,
আরো ভাল হয় যদি তিনচার জন
ভলেন্টিয়ার আগে থেকে সেই
প্রফেসরের সাথে যোগাযোগ করে।
যেন তিনি আগেই একবার তাদের উপর
পরীক্ষা করে বুঝতে পারে যে কাকে
কাকে সে হিপনোটাইজ করতে
পারবে। ততক্ষনে আমার উত্তেজনা
আরো বেড়ে গেছে। এরপর আইজেনহার্ট
আমাদের কাছে ‘আকুল আবেদন’ করলেন
যেন আমরা কেউ ভলেন্টিয়ার হতে
রাজি হই! (হায় খোদা!)
আইজেন হার্ট ছিলেন ডাইনিং হলের
এক পাশে আর আমি ছিলাম অনেক
পিছনে সম্পুর্ণ বিপরীত দিকে। আরো
কয়েকশ ছেলে ছিল সেখানে। আমি
জানতাম অন্য সবাইও এই সুযোগের জন্য
মুখিয়ে আছে, ভয় পাচ্ছিলাম যে এত
পিছনে থাকাতে সে হয়তো আমাকে
দেখতেই পাবেনা। যেকরেই হোক এই
ডেমন্সট্রেশনে আমাকে যেতেই হবে!
এর পর যেইনা আইজেনহার্ট বলল, “ ...এবং
এজন্য তোমাদের মধ্যে কি কেউ
ভলেন্টিয়ার হতে ইচ্ছুক?”
আমি লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে
হাত উচু করে, “আমিইইইইইইইইইইই!” বলে
সর্বশক্তি দিয়ে ভয়ানক এক চিৎকার
দিলাম। যাতে আমাকে খেয়াল না
করা কোন সম্ভবনাই না থাকে।
অবশ্য সে আমাকে ঠিকই শুনতে
পেয়েছিল। কারণ ডাইনিং হলের আর
একটা ছেলেও টু শব্দটিও করেনি। কিন্তু
তখনো সেই চিৎকার সেই সুবিশাল
ডাইনিং হলে ধ্বনিত্ব-প্রতিধ্বনিত্ব
হচ্ছে। পুরো ব্যপারটাই ছিল খুবই
বিব্রতকর।
শেষমেষ অবশ্য আরো কয়েকজন
ভলেন্টিয়ার পাওয়া গেল।
ডেমন্সট্রেশনের সপ্তাহ খানেক আগে
সেই প্রফেসর আসলো আমাদের উপর
পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে যাতে
সবচেয়ে সুইটেবল ভলেন্টিয়ার কে
খুজে বের করা যায়। বশীকরণ প্রকৃয়া
সম্পর্কে আমার আগেই জানা ছিল
কিছুটা, কিন্তু হিপনোটাইজড হতে
কেমন লাগবে, সেটাই ছিল মূল আকর্ষণ।
সে আমার উপর বশীকরণ শুরু করল, এবং একটু
পরেই আমি এমন অবস্থায় পৌছলাম যখন
সে বলল, “এখন তুমি আর তোমার চোখ
খুলতে পারবে না।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, “চোখ তো
আমি চাইলেই খুলতে পারব, কিন্তু খুলব
না, দেখি এই ব্যাটা আর কতদূর কি করে”
পুরো সিচুয়েশনটাই ইন্টারেস্টিং: যেন
তোমার চিন্তাভাবনা যাস্ট একটু
ঘোলাটে হয়ে গেছে, এবং যদিও তুমি
কিছুটা অবচেতন হয়ে গেছ, তারপরও তুমি
পুরোপুরি নিশ্চিত যে তুমি চাইলেই
তোমার চোখ খুলতে পারবে। কিন্তু
আসলে তুমি তা করছ না, অন্যভাবে
দেখলে তুমি আসলে চোখ খুলতে পারছ
না!
সে আরো অনেক কিছু করল, এবং শেষে
সিদ্ধান্ত নিলো যে আমাকে দিয়ে
চলবে।
আসল প্রদর্শনীর দিন সে আমাদের
(ভলেন্টিয়ার) সবাইকে স্টেজের উপর
নিয়ে গেল তারপর পুরো প্রিন্সটন
গ্রাজুয়েট কলেজের সামনে আমাদের
হিপনোটাইজ করে ফেলল। এইবার তার
বশীকরণের প্রভাব ছিল আগের চেয়ে
শক্তিশালী, এর একটা কারণ হতে
পারে যে, আমি আগে একবার
প্রাকটিস করেই কিভাবে
হিপনোটাইজ হতে হয় তা ভালমত শিখে
গেছি। সে আমাকে দিয়ে এমন অনেক
কিছু করালো যা নরমাল অবস্থায় আমি
এমনিতে করতাম না। এবং সব শেষে সে
বলল, হিপনোটাইজড অবস্থা থেকে বের
হয়ে নিজের সিটে ফিরে যাবার সময়
আমি নাকি সোজাসুজি না গিয়ে
পুরো হল ঘুরে পিছন দিক দিয়ে যাবো!
পুরো ডেমন্সট্রেশনের সময়টাতেই আমি
আবছা ভাবে হলেও হিপনোটিস্টের
কর্মকান্ড সম্পর্কে পুরোটা সময় সচেতন
ছিলাম। আর ইচ্ছা করেই সহযোগিতা
করছিলাম তাকে। কিন্তু এইবার
ভাবলাম, ‘ধুরো! অনেক হয়েছে, আর না।
আমি সোজা গিয়ে নিজের সীটে
বসে পড়ব।’
ডেমো শেষে উঠে নিজের সিটে
যাবার সময় সোজা নিজের সিটের
দিকে রওনা দিলাম। কিন্তু তখনই কেমন
যেন একটা অস্বস্তি হতে লাগল।
অস্বস্তিটা এতই বেড়ে যাচ্ছিল যে
আমি আর সোজা যেতে পারলাম না।
পুরোটা হলে ঘুরে গেলাম!
পরে অন্য এক সময় এক মহিলাও আমাকে
হিপনোটাইজ করেছিল। সেবার আমি
হিপনোটাইজড অবস্থায় থাকতে সে
বলেছিল, “এখন আমি একটা ম্যাচের
কাঠি জ্বালাবো, তারপর ফু দিয়ে
নিভিয়েই সাথে সাথে তোমার
হাতের পিছনে চেপে ধরব। কিন্তু তুমি
কোন ব্যথা পাবেনা”
আমি ভাবলাম, ‘হাহ্ আজগুবি!’ তারপর
সে একটা ম্যাচ নিল, সেটা
জ্বালালো, ফু দিয়ে নিভিয়েই আমার
হাতের পিছনে চেপে ধরল। আমার
হাতে খুবই অল্প গরম একটা আঁচ লাগলো
যেন। পুরোটা সময় আমার চোখ বন্ধ ছিল,
তাই আমি ভাবছিলাম, ‘ও এই ব্যপার! সে
নিশ্চই ম্যাচের একটা কাঠি
জ্বালিয়েছে, কিন্তু ছোয়ানোর সময়
অন্য একটা কাঠি ছুইয়েছে। এর মধ্যে
কোন ব্যপার-স্যপার নাই। পুরাটাই
ভগিজগি’
কিন্ত সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজটা
পেয়েছিলাম হিপনোসিস থেকে বের
হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে!
হাতের পিছনে একটা জ্বলজ্যান্ত
পোড়া দাগ ছিল। একটু পরেই সেখানে
ফোস্কা পড়ে গেল। মজার ব্যপার হল,
এটা কখনই ব্যথা করেনি। এমন কি
ফোস্কাটা ফেটে যাবার সময়ও!
হিপনোসিস তাই আমার কাছে খুবই
ইন্টারেস্টিং একটা অভিজ্ঞতা। যেন
পুরোটা সময় তুমি নিজেকে বলছ, “এটা
তো আমি চাইলেই করতে পারব, কিন্তু
এখন করবনা”--যেটা কিনা একটু
অন্যভাবে বলা, যে তুমি আসলে
পারবে না!!

0 comments:

Post a Comment